আজানের প্রচলন শুরু হয় যেভাবে /আযান দেওয়া কিভাবে শুরু হয় ?ও তাৎপর্য ।

প্রশ্নোত্তর শিক্ষা

নামাজের জন্য মানুষকে আহ্বান করার একমাত্র মাধ্যম হলো আজান। জামাআতে নামাজ পড়ার জন্য আজান দেয়া সুন্নাত। কেউ কেউ একে ওয়াজিব বা আবশ্যক বলেছেন। আজান ওহী না হলেও কতিপয় সাহাবায়েকেরামের স্বপ্নেপ্রাপ্ত বাক্য। যাই হোক নামাজের জন্য আজান অনেক গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আজানই মানুষকে দ্রুত নামাজের জন্য তৈরি হতে উদ্বুদ্ধ করে।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে পবিত্র নগরী মক্কায় আজান ছাড়াই নামাজ পড়া হতো। প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মদিনায় হিজরত করে মসজিদ নির্মাণ করলেন তখন মুসলমানদের নামাজে অংশগ্রহণের জন্য একত্রিত করতে একটি সুনির্দিষ্ট সংকেত নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন এবং সাহাবাদের কাছে পরামর্শ চাইলেন।

সাহাবাদের পরামর্শ
সাহাবায়েকেরাম নামাজে অংশগ্রহণ একত্রিত হওয়ার জন্য সংকেত ঠিক করতে পরামর্শ সভায় বসলেন। পরামর্শ সভায় ৪টি প্রস্তাব উপস্থাপন হয়।
>> ঝাণ্ডা উড়ানো;
>> আগুন প্রজ্জ্বলন;
>> শিঙ্গা বাজানো;
>> ঢোল বাজানো।

পরমার্শ সভার ৪টি প্রস্তাবই প্রত্যাখ্যান করা হয়। কারণ ঝাণ্ডা উড়ালে সব মানুষ তা বাড়ি বা দূর থেকে দেখতে পাবে না। দ্বিতীয়ত আগুন প্রজ্বলন অগ্নি উপাসকদের কাজ। তৃতীয়ত শিঙ্গা বাজানো খ্রিস্টানদের কাজ আর চতুর্থত ঢোল বাজানো ইয়াহুদিদের কাজ। এ কারণে সেদিন সমাধান ছাড়াই পরামর্শ সভার মূলতবি করা হয়।

সাহাবায়েকেরামগণ এ বিষয়টি নিয়ে চিন্তা করতে করতেই যার যার বাড়ি চলে গেলেন। ঐ রাতে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ স্বপ্নে দেখেন-

‘এক ব্যক্তি শিঙ্গা নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি ঐ ব্যক্তিকে শিঙ্গাটি বিক্রি করতে বললে। শিঙ্গাটি কেনার কারণ জানতে চাইলে আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ বললেন, ‘আমি শিঙ্গাটি দিয়ে মানুষকে নামাজে আসার জন্য আহ্বান করব।’
তখন শিঙ্গার মালিক ব্যক্তি বলল, ‘আমি কি এটি হতে উত্তম একটি জিনিসের সংবাদ দিব না? এ বলে তিনি আজানের বাক্যগুলো তাঁকে শিখিয়ে দিলেন।

সকালে হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে হাজির হয়ে স্বপ্নের কথাগুলো জানালেন। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ‘তোমার স্বপ্ন সত্য। তুমি বেলালকে আজানের বাক্যগুলো শিখিয়ে দাও। আজ থেকে বেলাল আজান দেবে।’

হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদের শেখানো বাক্যগুলো দিয়ে হজরত বেলাল আজান দিলে, তা শুনে হজরত ওমর রাদিয়াল্লাহু আনহু প্রিয়নবির দরবারে দৌড়ে এসে বললেন-

‘হে আল্লাহর রাসুল! ঐ সত্তার শপথ যিনি আপনাকে সত্য রাসুল হিসেবে প্রেরণ করেছেন। অবশ্যই আমি অবিকল এ বাক্যগুলোই স্বপ্নে দেখেছি।’

উল্লেখ্য যে, ঐ রাতে একই স্বপ্ন সাহাবিদের মধ্য থেকে ১৪ জনই দেখেন। যার মাধ্যমে নিয়মিত হজরত বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু নামাজের জন্য আজান দিতেন।

ফজরের আজানের বাড়তি বাক্য ‘আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাওম’ সম্পর্কে জানা যায় যে-
একদিন ফজরের সময় হজরত বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু আজান দিতে আসলেন, তখন তাকে বলা হলো, প্রিয়নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘুমে আছেন। তখন হজরত বেলাল রাদিয়াল্লাহু আনহু উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করলেন-
‘আস-সালাতু খাইরুম মিনান নাওম। অর্থাৎ ঘুমের চেয়ে নামাজ উত্তম।’

হজরত সাঈদ ইবনে মুসায়্যিব বলেছেন, ‘পরে ফজরের আজানের সঙ্গে এ বাক্যটি শমিল করে দেয়া হয়।’

আর এভাবেই সর্বপ্রথম আজানের প্রচলন হয়। আজানের আওয়াজ শুনার সঙ্গে সঙ্গে মুসলমানরা মসজিদে জামাআতে নামাজ আদায়ে একত্রিত হয়।

জামাআতে নামাজ আদায়ের জন্য আজান দেয়া সুন্নাত। আবার কেউ কেউ একে ওয়াজিব বলেছেন।

তবে আজান দেয়া সুন্নাত বা ওয়াজিব যা-ই হোক না কেন, আজান ইসলামের প্রতীক। কারণ রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যদি কারও বিপরীতে অভিযান পরিচালনা করতেন; ঐ সময় তাদের মধ্য থেকে যদি আজানের ধ্বনি আসত তবে তিনি তাদের সঙ্গে অভিযান বন্ধ করে দিতেন এবং বলতেন, তারা মুসলিম।’

তাৎপর্য।

 

চিত্র:Adhan in Shalqar mosque.webm
কাজাকিস্তানের মাতেই মসজিদে আযানের দৃশ্য .
আযান আরবি: أَذَان‎‎ (অথবা আজান হিসেবে উচ্চারণ করা হয় যেমন: আফগানিস্তান, আজারবাইজান, বাংলাদেশ, ভারত, ইরান, মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, তাজিকিস্তান, এবং তুর্কমেনিস্তান, ইজান হিসেবে উচ্চারণ করা হয় তুরস্ক, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা), আজন হিসেবে উচ্চারণ করা হয় উজবেকিস্তান, মুয়াজ্জিন কর্তৃক প্রার্থনার উদ্দেশ্য দিনের নির্ধারিত সময়ে ৫ বার আহবান করাকে আযান বলা হয়। সংজ্ঞা : ‘আযান’ অর্থ, ঘোষণা ধ্বনি (الإعلام)। পারিভাষিক অর্থ, শরী‘আত নির্ধারিত আরবী বাক্য সমূহের মাধ্যমে নির্ধারিত সময়ে উচ্চকণ্ঠে ছালাতে আহবান করাকে ‘আযান’ বলা হয়। ১ম হিজরী সনে আযানের প্রচলন।[১] হয়।ʾআযান শব্দের মূল অর্থ দাড়ায় أَذِنَ ডাকা,আহবান করা। যার মূল উদ্দেশ্য হল অবগত করানো। এই শব্দের আরেকটি বুৎপত্তিগত অর্থ হল ʾআজুন। (أُذُن), যার অর্থ হল “শোনা”। পবিত্র কুরআনে মোট পাঁচ স্থানে أذان শব্দটি এসেছে । এর মহাত্ম্য হচ্ছে আমাদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়েছে । তার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব প্রদান ।

আযানের কথা বা বাক্যসমূহ

আবৃত্তি আরবি প্রতিবর্ণীকরণ অনুবাদ বর্ণ
৪ বার* الله اكبر আল্লাহু আকবার আল্লাহ সর্বশক্তিমান সুন্নী এবং শিয়া
২ বার اشهد ان لا اله الا الله আশহাদু-আল লা- ইলাহা ইল্লাল্লাহ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন মাবুদ নেই সুন্নী এবং শিয়া
২ বার اشهد ان محمد الرسول الله আশহাদু-আন্না মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, মুহাম্মদ (স) আল্লাহর প্রেরিত দূত সুন্নী এবং শিয়া
২ বার حي على الصلاة হাইয়া আলাস সালা নামাজের জন্য এসো সুন্নী এবং শিয়া
২ বার حي على الفلاح হাইয়া আলাল ফালা সাফল্যের জন্য এসো সুন্নী এবং শিয়া
২ বার الصلاة خير من النوم আস সলাতু খাইরুম মিনান নাউম ঘুম হতে নামাজ উত্তম** (Fajr prayer only) সুন্নি
২ বার حي على خير العمل Hayya ‘alā khayril-‘amal Make haste towards the best deed শিয়া
২ বার الله اكبر আল্লাহু আকবার আল্লাহ্ মহান সুন্নী এবং শিয়া
১ বার** لا اله الا الله লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কোন উপাস্য নেই সুন্নী এবং শিয়া

আযানের প্রচলন

আযানের সময়

প্রতি দিন-রাতে বিভিন্ন সময়ে পাঁচ বার আযান দেওয়া হয়। আর আযান তখনই দেওয়া হয় যখন নামাযের সময় হয়। নীচে আযানের সময় দেওয়া হল: ১। ফজর:সবহে সাদিক উদিত হলে। সূর্য পূর্ব আকাশে উদিত হওয়ার আগ মুহূর্তে । ২। যোহর: সূর্য পশ্চিম আকাশে একটু ঢলে গেলে । ৩। আছর:সূর্যের প্রখরতা থাকতে । ৪। মাগরিব:সূর্য অস্ত যাওয়ার সাথে সাথে । ৫। এশা: সূর্য অস্ত যাওয়ার পর রাতেরএক তৃতীয়াংশে । [২]

হযরত বেলালের আযান

হযরত বেলাল ইসলামের ইতিহাসে প্রথম আযান দেন। তার আযানের ধ্বনি শুনে মদীনাবাসী একত্র হয়ে মসজিদ-এ-নববীতে আসেন সালাত (নামায) আদায় করার জন্য। রাসুল সা. এর নির্দেশে তিনিই প্রথম মদিনার মসজিদে নববীতে আযান প্রদান করেন । উল্লেখ্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কায় আযান ও একামত ছাড়া নামাজ পড়েছেন। [৩]

ফযরের নামাজের আযান

ফযরের নামাজের আযানে একটু ব্যতিক্রম আছে। আর তা হলো এই যে আযানের শেষভাগে “হাইয়া আলাল ফালাহ” দুই বার বলার পরে “আসসালাতু খাইরুম মিনান নাউম” বাক্যটি দুই বার বলতে হবে। এর পর যথারীতি “আল্লাহু আকবার”, “আল্লাহু আকবার”, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” বলে আযার শেষ করতে হবে।

জুমার নামাজের আযান

জুমার নামাজের আযান দুইবার দিতে হয়। প্রথমত নামাযের ওয়াক্ত হলে মুয়াযযিন প্রথমবার আযান দেবেন। আবার মূল খুৎবা শুরুর আগে, ইমাম তথা খতীব মিম্বরে আসীন হলে ঠিক তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ‌‌‌মুআযযিন দ্বিতীয়বার আযান দিবেন, একে বলা হয় সা-নী আযান। খুৎবা শেষে নামাজ শুরুর প্রাক্কালে ‌‌‌মুআযযিন যথারীতি ইকামত দিবেন।

আযানের দোয়া

আযানের উত্তর দেওয়া ওয়াজিব । মুয়াযযিন যখন আযানের এক-একটি বাক্য বলা শেষ করবেন তখন শ্রোতা তার উত্তরে একই বাক্য পাঠ করবেন। আযান মনোযোগ দিয়ে শুনতে হয়। এ সময় কোনো কাজ করা বা কথা বলাও নিষেধ। এমনকি এসময় কুরআন শরীফ পাঠ করা স্থগিত রাখতে হয়। আযান শেষে দরুদে ইবরাহীম বা দরুদ শরীফ পড়ে এই দোয়া পড়তে হয়। আযানের দোয়া হলো:

আরবিঃ اللَّهُمَّ رَبَّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ وَالصَّلَاةِ الْقَائِمَةِ آتِ سَيّدِنَا مُحَمَّدَاً الْوَسِيلَةَ وَالْفَضِيلَةَ وَابْعَثْهُ مَقَامَاً مَحْمُودَاً الَّذِي وَعَدْتَهُ وَارْزُقْنَا شَفَا عَتَهُ يَوْمَ الْقِيَامَتِه إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيعَادَ

উচ্চারণঃ আল্লাহুম্মা রাব্বাহাযিহিদ দাওয়াতিত্তাম্মাহ ওয়া সালাতি ক্বায়িমা, আতি সায়্যিদিনা মুহাম্মাদানিল ওয়াসিলাতা ওয়াল ফাদিলা ওয়াদ্দারাজাতার রাফিয়াহ, ওয়াব আসহু মাক্কামাম্মাহমুদানিল্লাযি ওয়া আত্তাহ, ওয়ার যুক্বনা শাফা’আতাহু ইয়াওমাল ক্বিয়া-মাহ ইন্নাকা লা তুখলিফুল মিয়াদ।

তথ্যসূত্র

  1. Sunan al-Tirmidhi (Arabic) Chapter of Fitan,
    2:45 (India) and 4:501 Tradition # 2225 (Egypt)
    Hadith #2149 (numbering of al-‘Alamiyyah)

::আল্লাহ তা্আলা মুসলিম উম্মাহকে আজানের সঙ্গে সঙ্গে জামাআতে নামাজ আদায়ে মসজিদে একত্রিত হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।

Share Now

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *